নির্বাচনী ময়দানে খেলার মাঠের যে তারকারা
গোটা জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য। আগামীকাল সেই কাক্সিক্ষত দিন। দেশব্যাপী হবে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের মানুষ দীর্ঘদিন পর তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ভোট প্রদানের জন্য মুখিয়ে আছেন। সব জায়গায় বিরাজ করছে নির্বাচনী আমেজ, উত্তাপ। নির্মল বিনোদনের মাধ্যম ক্রীড়াঙ্গনও এর বাইরে নয়।
খেলার মাঠেও বয়ে চলেছে জাতীয় নির্বাচনের হাওয়া। কেননা এবারের নির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন একঝাঁক সাবেক খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠক। খেলার পাশাপাশি রাজনৈতিক মঞ্চেও বাজিমাত করতে চান তারা। তাদের লক্ষ্য নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে প্রবেশ করে জনগণের কল্যাণে কাজ করা। পাশাপাশি দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে অবদান রাখা।
এবারের নির্বাচনকে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যেখানে শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই নয়; ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন ক্রীড়াঙ্গনের অনেকেই। এবারের নির্বাচনে ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের প্রায় সবাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি থেকে। ভোটের ময়দানে লড়াইয়ের জন্য বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন ২৮ ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়া সংগঠক। বিএনপির বাইরে মাত্র ২ ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ দু’জনও বিভিন্ন সময়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। খেলার পাশাপাশি রাজনৈতিক মঞ্চেও বাজিমাত করতে চান এসব ক্রীড়া তারকা।
এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বিএনপির মনোনয়নে ক্রীড়াবিদদের জয়জয়কার। কেননা এবারের নির্বাচনে বিএনপি থেকে মোট ২৮ ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব মনোনয়ন পেয়েছেন। তারা হলেনÑসাবেক তারকা ফুটবলার মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (ভোলা-৩), জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও তারকা গোলরক্ষক আমিনুল হক (ঢাকা-১৬), মোহামেডান স্পোর্র্টিং ক্লাবের সাবেক সদস্য সচিব ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (ঠাকুরগাঁও-১), সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মির্জা আব্বাস (ঢাকা-৮), মোহামেডানের সাবেক সদস্য সচিব মনিরুল হক চৌধুরী (কুমিল্লা-৬), বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি ও ঢাকা আবাহনীর সাবেক পরিচালক আলী আসগর লবি (খুলনা-৫), ঢাকা মোহামেডানের সাবেক সহসভাপতি শরিফুল আলম (কিশোরগঞ্জ-৬), মোহামেডানের সাবেক পরিচালক জয়নাল আবেদীন ফারুক (নোয়াখালী-২), ক্রীড়া সংগঠক বরকত উল্লাহ বুলু (নোয়াখালী-৩), ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি খায়রুল কবির খোকন (নরসিংদী-১), আবাহনীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু (সিরাজগঞ্জ-২), ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ও ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন (ঢাকা-৬), বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ক্রিকেট বিপিএলের দল ঢাকা ক্যাপিটালসের অন্যতম স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম আজাদ (নারায়ণগঞ্জ-২), সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী (মাগুরা-২), বিপিএলের দল ঢাকা ক্যাপিটালসের অন্যতম স্বত্বাধিকারী রাশেদুজ্জামান মিল্লাত (জামালপুর-১), সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও ভলিবল খেলোয়াড় এহসানুল হক মিলন (চাঁদপুর-১), আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের সাবেক সভাপতি শেখ ফরিদউদ্দিন আহমদ মানিক (চাঁদপুর-৩), বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন বাফুফের কাউন্সিলর ফরহাদ হোসেন আজাদ (পঞ্চগড়-২), বাফুফের কাউন্সিলর শাহ মো. ওয়ারেস আলী মামুন (জামালপুর-৫), যাত্রাবাড়ী ক্রীড়া চক্রের সভাপতি নবী উল্লাহ নবী (ঢাকা-৫), বাড্ডা জাগরণী ক্রীড়া সংসদের উপদেষ্টা এমএ কাইয়ুম (ঢাকা-১১), দিলকুশা ক্লাবের সভাপতি হাবিবুর রশিদ হাবিব (ঢাকা-৯), বিসিবির কাউন্সিলর ও চট্টগ্রাম ব্লুজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান মীর হেলাল (চট্টগ্রাম-৫) এবং খুলনা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু (খুলনা-২)।
এছাড়াও বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক ক্রীড়া সংগঠকদের ছেলেমেয়েরাও। ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হয়েছে ওয়ারী ক্লাবের আজীবন সদস্য প্রয়াত হারুনুর রশিদ মুন্নুর মেয়ে বিএনপি নেত্রী আফরোজা খান রিতা (মানিকগঞ্জ-৩), ঢাকা আবাহনীর সাবেক সভাপতি প্রয়াত শামসুল ইসলাম খানের ছেলে মনিরুল ইসলাম খান (মানিকগঞ্জ-২), মোহামেডান গভর্নিং বডি ও ক্রিকেটের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত জাহেদ আলী চৌধুরীর ছেলে ফাহিম চৌধুরী (শেরপুর-২) এবং সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে ফারজানা শারমিন (নাটোর-১)।
বিএনপির বাইরে মাত্র দু’জন ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাফুফের সাবেক সভাপতি ও এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ চট্টগ্রাম-১৪ আসনে ১০ দলীয় জোট থেকে নির্বাচন করছেন। তিনিও একসময় বিএনপির মন্ত্রী ও সংসদ সসদ্য ছিলেন। এছাড়া সাবেক ফুটবলার সাজ্জাদ হোসেন লাভলু সিদ্দিকী মাদারীপুর-১ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। লাভলু সিদ্দিকী বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। এই হিসেবে দেখা যায়, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৩০ ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
ক্রীড়া তারকাদের মধ্যে দেশবাসীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও তারকা গোলরক্ষক আমিনুল হক। তিনি ঢাকা-১৬ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় ফুটবল দল, ঢাকা মোহামেডান, ঢাকা আবাহনী, ব্রাদার্স ইউনিয়ন, মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদসহ অনেক ক্লাবে দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে খেলেছেন আমিনুল। দীর্ঘদিন জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন। ২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ৪৫ বছর বয়সী এই তারকা। ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে ২০১০ সালে আমিনুলের যোগ্য নেতৃত্বে দক্ষিণ এশিয়ান গেমসের ফুটবলে স্বর্ণপদক জয় করে বাংলাদেশ।
নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত আমিনুল এখন পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ। খেলার মাঠ থেকে নির্বাচনী ময়দানে এসে তিনি দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করতে চান। সাবেক খেলোয়াড় হওয়ায় খেলাধুলা নিয়েও আছে তাঁর বিস্তর পরিকল্পনা। এই যেমন নির্বাচনে ধানের শীষের বিজয় হলে তিনি ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, নির্বাচনে বিজয়ী হলে ঢাকা শহরে অন্তত ৪০টি খেলার মাঠ নির্মাণ করা হবে। রাজধানীর মিরপুরের ইসিবি চত্বরে আয়োজিত এক নির্বাচনী পথসভায় তিনি এ ঘোষণা দেন।
তারেক রহমান বলেন, ইনশাআল্লাহ আপনাদের দোয়া ও আল্লাহর রহমতে যদি ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করতে পারে, তাহলে শুধু ঢাকা-১৭ আসনে নয়, বরং সমগ্র ঢাকা শহরে অন্তত ৪০টি খেলার মাঠ নির্মাণ করা হবে। এতে আমাদের সন্তানেরা খোলা মাঠে খেলাধুলার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি মুরব্বি, মা-বোনেরা প্রয়োজন অনুযায়ী মাঠে হাঁটাচলা করতে পারবেন। একঝাঁক ক্রীড়া তারকার নির্বাচনে অংশগ্রহণকে দারুণ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এতে করে দেশের ক্রীড়াঙ্গন আরও চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) সিনিয়র সহসভাপতি ও ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বলেন, ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের সংসদে, সংসদের বাইরে ও সরকারের নীতিনির্ধারণী ফোরামে ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। আমরা আশা করব যারা আগামীতে নির্বাচিত হবেন তারা ক্রীড়ার উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবেন।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: