বাফুফেতে চাঞ্চল্য: আদম পাচারের অভিযোগে নির্বাহীকে শোকজ, তদন্ত কমিটি গঠন
বাংলাদেশ ফুটবল অঙ্গনে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে গুরুতর এক অভিযোগকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)-এর নারী উইংয়ের নির্বাহী তৌহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ায় আদম পাচারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে শোকজ করা হয়েছে এবং ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
বাফুফের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, ঘটনাটি এতটাই গোপনে সংঘটিত হয়েছিল যে, বিষয়টি সামনে আসার পর বিস্মিত হয়েছেন ফেডারেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে এইচআর ও প্রশাসন বিভাগের আহসানুর রহমান রবিন এবং লিগ্যাল বিভাগের প্রধান তাসনুভা তাবাসসুম মহিমা চৌধুরীকে নিয়ে একটি দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত ২০ ফেব্রুয়ারি এএফসি এশিয়ান কাপ উপলক্ষে নারী ফুটবল দলের একটি অংশ অস্ট্রেলিয়া সফরে গেলে সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আদম পাচারের চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তৌহিদুল ইসলাম একটি সংঘবদ্ধ চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, যেখানে তার সহযোগী হিসেবে কাজ করছিলেন হুমায়ুন কবির ও আরাফাত হোসেন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাজধানীর মতিঝিলের কমলাপুর বাজার রোডে ‘সাগুফতা ডি লরেন্স’ নামের একটি ভবনে অফিস খুলে এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ম্যানপাওয়ার ব্যবসার আড়ালে প্রতারণামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তারা মূলত ফুটবল দলের খেলোয়াড় তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিত এবং এর মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিত।
ভুক্তভোগী মো. সাজেদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর আশ্বাসে চারজনের পাসপোর্টের বিপরীতে তিনি বিভিন্ন সময়ে মোট ১৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা প্রদান করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও ভিসা না পেয়ে টাকা ফেরত চাইলে তাকে ঘোরানো হয় এবং পরে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। তার ভাষ্য, “টাকা চাইতে গেলে তারা আমাকে গুম করার হুমকি দেয়। এমনকি এক পর্যায়ে যোগাযোগ বন্ধ করে গা ঢাকা দেয়।”
আরও জানা গেছে, বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য এই চক্রটি বাফুফে ও বিভিন্ন ক্লাবের নাম ব্যবহার করে ভুয়া ‘কনসার্ন লেটার’ ও প্রত্যয়নপত্র তৈরি করত। এসব কাগজে জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে তারা প্রতারণার জাল বিস্তার করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে অভিযুক্ত তৌহিদুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ভুক্তভোগী তার কাছে কোনো অর্থ দেননি; বরং তার এক সহযোগীকে টাকা দেওয়া হয়েছে। ভুয়া কাগজপত্রের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাকে হয়রানি করার জন্য এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমি কোনো জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত নই।” তবে চারটি পাসপোর্ট ফেরত দেওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত হুমায়ুন কবিরের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে এবং আরাফাত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া মেলেনি।
এ বিষয়ে বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষার বলেন, অভিযোগপত্র এখনও তার হাতে পৌঁছায়নি। তবে তিনি আশ্বস্ত করেন, “চিঠি পাওয়ার পর তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, তৌহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগেও অনুরূপ অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেসব অভিযোগ আলোর মুখ দেখেনি।
এ ঘটনায় ফুটবল অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা দ্রুত এই চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রতারিত অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্রীড়া প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রশ্নটিও নতুন করে সামনে এসেছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপরই এখন নির্ভর করছে পরবর্তী পদক্ষেপ। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু বাফুফের ভাবমূর্তিকেই নয়, দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সার্বিক সুনামকেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: