সাফের হ্যাটট্রিক শিরোপা মিশনে অধিনায়ক মারিয় মান্ডা
দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই আবারও শুরু হচ্ছে আজ। ভারতের পর্যটন নগরী গোয়ায় পর্দা উঠছে অষ্টম নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের। আগে জাতীয় দলের অধিনায়কের দায়িত্ব আফঈদা খন্দকার পালন করলেও এবার সাফের শিরোপা মিশনে দলের নেতা নির্বাচিত করা হয়েছে মারিয়া মান্ডাকে।
এবারের আসরে অংশ নিচ্ছে ছয়টি দেশ। তবে রাজনৈতিক কারণে অংশ নিচ্ছে না পাকিস্তান। আয়োজক দেশ ভারত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্ট থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয় তারা। তবুও দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসর ঘিরে উত্তেজনার কমতি নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য এবারের আসরটি ভিন্ন মাত্রার গুরুত্ব বহন করছে।
কারণ, টানা দুইবারের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ এবার নামছে ইতিহাস গড়ার মিশনে। ২০২২ ও ২০২৪ সালে শিরোপা জয়ের পর এবার লক্ষ্য হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়া। দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে নিজেদের আধিপত্য আরও দৃঢ় করতেই প্রস্তুত সাবিনা খাতুনদের উত্তরসূরিরা। নতুন প্রজন্মের আফঈদা, ঋতুপর্ণা, মনিকা, শামসুন্নাহারদের কাঁধে এখন বাংলাদেশের স্বপ্ন।
আসরের প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি রাখতে চায়নি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। প্রথমে চট্টগ্রামের কেপিজেডে দীর্ঘ অনুশীলন ক্যাম্প করেছে দল। এরপর উন্নত প্রস্তুতির জন্য দলকে পাঠানো হয় থাইল্যান্ডের ব্যাংককে। সেখানে প্রায় দুই সপ্তাহ নিবিড় অনুশীলনের পাশাপাশি দুটি প্রস্তুতি ম্যাচও খেলেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। কোচিং স্টাফের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক মানের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলিয়ে দলকে আরও পরিণত করে তোলা। রোববার আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তুতি নিয়ে বাংলাদেশের কোচ পিটার বাটলারের কথা, ‘আমাদের প্রস্তুতি অনেক ভাল হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এবং পরে থাইল্যান্ডে। মেয়েরা যথেষ্ট কষ্ট করেছে। আশাকরি তাদের এই প্রস্তুতি শিরোপা জিততে সহায়তা করবে।’
এশিয়ান কাপে ম্যাচ জিততে না পারায় বাংলাদেশ দলের ভবিষ্যত নিয়ে বাটলারকে খোঁচা দিয়ে স্থানীয় এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলে তা উত্তরে কোচের মন্তব্য, ‘আমি আপনার সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। আমি মোটেও মনে করি না যে এশিয়ান কাপে না জেতায় কোনো হতাশার ছিল। আমার মনে হয় আমরা সত্যিই প্রশংসনীয় পারফরম্যান্স দেখিয়েছি। আমাদের অনেক তরুণ খেলোয়াড় ভাল খেলেছে। বাংলাদেশ ফুটবলের ইতিহাসে এটিই প্রথমবার ছিল যে আমরা অনূর্ধ্ব-২০ এবং সিনিয়র দল, উভয় ক্ষেত্রেই কোয়ালিফাই করতে পেরেছিলাম। তাই আমি বিষয়টিকে কোনোভাবেই হতাশা হিসেবে দেখি না।’
তিনি যোগ করেন, ‘আমি বলব, ইতিহাস অতীত হয়ে গেছে। আমরা জানি আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে এবং আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছি। আমাদের দলে কিছু নতুন ও তরুণ খেলোয়াড় এসেছে। আপনারা জানেন, আমি মারিয়াকে দলে নিয়ে এসেছি এবং তাকে অধিনায়ক করেছি। সে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দলকে নেতৃত্ব দেবে। এবং আমার সত্যিই মনে হয় যে, এটি খেলোয়াড়দের জন্য ভাল। নিজেদের প্রমাণ করার একটি দারুণ সুযোগ, তবে তার চেয়েও বড় কথা, আপনারা জানেন, ইতিহাস তৈরি করার সুযোগ।’ বাংলাদেশের গ্রুপে শক্তিশালী ভারত রয়েছে। বিষয়টি এক সাংবাদিক মনে করিয়ে দিতেই বাটলারের উত্তর, ‘আমি বিষয়টিকে ঠিক ওভাবে দেখি না। আমি এই পেশায় অনেক, অনেক দিন ধরে আছি এবং অনেক টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছি। আমি কেবল মনে করি আপনাকে প্রতিটি দিন একটি একটি করে ধাপ পার করতে হবে। আপনাকে প্রতিটি দলকে তাদের নিজস্ব যোগ্যতা অনুযায়ী আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। অবশ্যই ভারত একটি শক্তিশালী দল, তাদের ভালো খেলোয়াড় আছে। তারা বেশ গোছানো থাকবে, তাছাড়া তারা নিজেদের ঘরের মাঠে খেলছে। আশা করি রেফারিরা নিরপেক্ষ থাকবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমি ভারতকে যেভাবে দেখি, মালদ্বীপকেও ঠিক একইভাবে দেখি। উভয় দলকেই সম্মান করি। আমাদের কেবল নিজেদের গেম প্ল্যানটি ঠিকঠাক সাজাতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন আমরা গোছানো থাকি এবং আমাদের গেম প্ল্যানটি যতটা সম্ভব পেশাদার ও দক্ষ উপায়ে মাঠে প্রয়োগ করতে পারি।
দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেও রয়েছে দারুণ আত্মবিশ্বাস। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে বাংলাদেশ নিজেদের নতুন শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এক সময় যেখানে ভারত ও নেপালের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট, সেখানে এখন বাংলাদেশের নামই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। ধারাবাহিক সাফল্য মেয়েদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। তবে এবার পথটা সহজ হবে না। স্বাগতিক ভারত নিজেদের মাটিতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে চায়। নেপালও আগের তুলনায় অনেক গোছানো দল। পাশাপাশি ভুটান ও মালদ্বীপের মেয়েরাও উন্নতির ধারায় রয়েছে। তাই প্রতিটি ম্যাচেই সর্বোচ্চ মনোযোগ ধরে রাখতে হবে বাংলাদেশকে। টানা দুই আসরে শিরোপা জেতার পর এবার হ্যাটট্রিক সুযোগ। এটা কোন চাপ হবে কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তরে অধিনায়ক মারিয়া মান্ডার কথা, ‘আমরা জানি, সব দলই ভাল। তাই শিরোপার পথে একটু চাপ তো থাকবেই। আমরা চেষ্টা করব আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে ভাল করার।’
যদিও আজ থেকেই মাঠে গড়াচ্ছে টুর্নামেন্ট, বাংলাদেশের অভিযান শুরু হবে ২৮ মে। নিজেদের প্রথম ম্যাচে মালদ্বীপের মুখোমুখি হবে তারা। তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ হলেও কোনো দলকেই হালকাভাবে নিচ্ছে না বাংলাদেশ শিবির। কোচ ও খেলোয়াড়রা শুরু থেকেই জয় দিয়ে টুর্নামেন্টে আত্মবিশ্বাসী অবস্থান তৈরি করতে চান।
বাংলাদেশ দলের বড় শক্তি এখন তাদের সমন্বিত ফুটবল। মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত আক্রমণ এবং রক্ষণে শৃঙ্খলাবোধ—সব মিলিয়ে দলটি আগের চেয়ে অনেক পরিণত। বিশেষ করে ঋতুপর্ণা চাকমার গতি ও আক্রমণভাগে কার্যকর উপস্থিতি প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি হতে পারে। একই সঙ্গে তরুণ ফুটবলারদের সঙ্গে অভিজ্ঞদের মিশেলে ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল গড়ে উঠেছে।
দেশের ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশাও এবার অনেক বেশি। টানা দুই শিরোপার পর বাংলাদেশের নারী দল এখন কোটি মানুষের গর্বের প্রতীক। ছেলেদের ফুটবলে যেখানে দীর্ঘদিন সাফল্যের খরা, সেখানে মেয়েরাই দেশের ফুটবলে এনে দিয়েছে নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। সেই স্বপ্নকে আরও উজ্জ্বল করতেই এবার গোয়ার মঞ্চে নামছে লাল-সবুজের মেয়েরা। এখন দেখার বিষয়, দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখে বাংলাদেশ কি পারে নতুন ইতিহাস গড়তে। লাল সবুজের মেয়েদের হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের সেই মহামিশনের শুরু হচ্ছে আর কয়েক দিনের মধ্যেই।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: