যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকের রূপকথার নায়ক আয়মেন হুসেইন
দীর্ঘ ৪০ বছরের অপেক্ষা শেষে ইরাক যখন ফিফা বিশ্বকাপে পা রেখেছে, তখন পুরো ইরাকি জাতির চোখের মণি হয়ে উঠেছেন আয়মেন হুসেইন।
বলিভিয়ার বিপক্ষে মহাদেশীয় প্লে-অফ ফাইনালের ভাগ্যনির্ধারণী ম্যাচে জয়সূচক গোল করে দেশকে বিশ্বকাপের মূল পর্বে নিয়ে গেছেন। সেই আয়মেনের সাফল্যের গল্পটা ঠিক রূপকথার মতো নয়—বরং এটি রক্ত, অশ্রু আর অসীম সাহসিকতার এক বাস্তব দলিল।
১৯৯৬ সালে উত্তর-মধ্য ইরাকের আল-হাওইজা জেলার আল-সাফরা গ্রামে জন্ম আয়মেনের। মেষপালন ও কৃষিকাজ করা এক সাধারণ পরিবারে তার শৈশব কেটেছে যুদ্ধবিদ্ধস্ত পরিবেশে। ২০০৮ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি তার জীবনে প্রথম বড় আঘাতটি পান। আল-কায়েদার নৃশংস হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান তার বাবা, যিনি ইরাকি সেনাবাহিনীর সৈনিক ছিলেন।
সেই ট্র্যাজেডি কাটতে না কাটতেই কয়েক বছর পর আরেকটি বিপর্যয় নেমে আসে আয়মেন হুসেইনের পরিবারে। বাবার মৃত্যুর পর তার বড় ভাই ইরাকি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই অঞ্চলে আইএসআইএল (আইএস) এর উত্থানের সময় একদিন তিনি অপহৃত হন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আজও তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
পারিবারিক এই বিপর্যয় আয়মেনকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলেছিল। সংসারের হাল ধরতে তিনি ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আয়মেনের মায়ের অদম্য জেদ তাকে থামতে দেয়নি। আয়মেন স্মৃতিচারণ করে বলেন, “মা আমাকে বলেছিলেন—‘এটা তোমার স্বপ্ন, আমি জানি। আর তোমাকেই এটা পূরণ করতে হবে’। মায়ের সেই কথাগুলোই আমাকে আজ এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।”
২০১২ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে কুর্দিস্তান অঞ্চলের দল দোহুক ফুটবল ক্লাবে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় আয়মেনের পেশাদার ক্যারিয়ার। সেটিই ছিল তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। পরবর্তীতে তিনি বাগদাদের শীর্ষ ক্লাব আল-শোর্টা, আল-তালাবা এবং আল-জাওরাতে খেলে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। কাতারের আল-খোর ক্লাব ঘুরে বর্তমানে তিনি খেলছেন ইরাকের আল-কারমা ক্লাবে। প্রায় ১ মিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে তিনিই এখন ইরাকের ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ফুটবলার।
আয়মেন আজ সাফল্যের শিখরে পৌঁছালেও প্রতি মুহূর্তে মনে করেন তার বাবা ও ভাইকে। ২০১৬ সালে কাতারকে হারিয়ে রিও অলিম্পিকে কোয়ালিফাই করা, ২০২৩ সালের গালফ কাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ট্রফি জেতা কিংবা ২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়াকে হারিয়ে প্যারিস অলিম্পিকের টিকিট কাটা-প্রতিটি ঐতিহাসিক মুহূর্তেই বাবা ও ভাইয়ের অনুপস্থিতি তাকে পুড়িয়েছে।
১৯৮৬ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপে ‘লায়ন্স অব মেসোপটেমিয়া’ খ্যাত ইরাক। গ্রুপ পর্বে তাদের লড়তে হবে ফ্রান্স, সেনেগাল ও নরওয়ের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে। ইতোমধ্যে নরওয়ের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে ৪-১ ব্যবধানে হারলেও জালের দেখা পেয়েছেন আয়মেন। কঠিন গ্রুপ হলেও আয়মেনকে নিয়ে আশাবাদী দেশের সাবেক ও বর্তমান ফুটবলাররা।
ইরাকের সাধারণ সমর্থকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে খেলা দেখা আকাশকুসুম কল্পনা হলেও, দেশের কোটি মানুষের আবেগ এখন আয়মেনকে ঘিরে। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা এই স্ট্রাইকার বিশ্বকাপে বল পায়ে নামলে মেসোপটেমিয়ার গর্জন শোনা যাবে পুরো বিশ্বজুড়ে। আয়মেনের হাত ধরে ইরাক গ্রুপ পর্বের বাধা পার হতে পারে কি না, সেটিই এখন ফুটবলপ্রেমীদের অন্যতম কৌতূহলের বিষয়।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: