[email protected] শুক্রবার, ১৯শে জুন ২০২৬
৫ই আষাঢ় ১৪৩৩

'দেখো মা, আমরা পেরেছি,' ইসমাইল কোনের জীবনের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৯ জুন ২০২৬ ১৫:০৬ পিএম

ফুটবল বিশ্বে এমন কিছু গল্প থাকে যা কেবল মাঠের জয়-পরাজয়কে ছাপিয়ে মানুষের জীবন সংগ্রাম, ত্যাগ এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। আইভরি কোস্টের যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর থেকে উঠে এসে ইউরোপের শীর্ষ লিগ ও বিশ্বকাপের মঞ্চ কাঁপানো কানাডিয়ান মিডফিল্ডার ইসমায়েল কোনের জীবন ঠিক তেমনই এক রূপকথা।

২০২২ সালে যখন মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি কাতারে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলার টিকিট পান, তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার মায়ের উদ্দেশ্যে একটি লাইন লিখেছিলেন যা অনেককেই কাদিয়েছিল— 'দেখো মা, আমরা পেরেছি'।

আইভরি কোস্টের আবিদজানে সালিফু কোনে এবং মা সুজান দিওমান্দের ঘরেই ২০০২ সালের ১৬ জুন জন্ম কোনের। তার শৈশ ছিল অত্যন্ত কঠিন, কারণ সে সময় আইভরি কোস্টে ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধ চলছিল। ২০১০ সালে, মাত্র সাত বছর বয়সে, কোনে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি হন। যুদ্ধ ও দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে মায়ের হাত ধরে কানাডার মন্ট্রিয়ালে পা রাখেন কোনে।

কানাডায় আসার পর কোনে ও তার মায়ের জীবন সহজ ছিল না। সম্পূর্ণ নতুন সংস্কৃতি, তীব্র শীত এবং ভাষা না জানার কারণে শৈশবে কোনে একাকীত্বে ভুগতেন। নতুন দেশে এসে তার মা একটি ব্যাংকে সাধারণ চাকরি করে কঠোর পরিশ্রমে ছেলেকে বড় করতে থাকেন। এই কঠিন সময়ে ফুটবলই হয়ে ওঠে কোনের একমাত্র আশ্রয় ও ভাষা।

৯ বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব এএস নটর-ডেম-ডি-গ্রেস প্যানথার্স-এর হয়ে তার ফুটবল যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৬ বছর বয়সে তিনি যোগ দেন সিএস সেন্ট-লরেন্ট ক্লাবে। সেখানে তার অসামান্য নৈপুণ্যে ২০১৯ সালের কানাডিয়ান অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ মেডেল জেতে দল।

কোনের প্রতিভা দেখে বেলজিয়ামের ক্লাব ‘গেঙ্ক’ এবং ‘মুসক্রন’ তাকে ট্রায়ালের জন্য ডাকে। মুসক্রন তাকে চুক্তি সই করাতে চাইলেও, ইউরোপীয় বহির্ভূত খেলোয়াড়দের জন্য থাকা কঠিন আর্থিক ও আইনি জটিলতার কারণে তারা ব্যর্থ হয়। এরপরই বিশ্বজুড়ে আছড়ে পড়ে কোভিড-১৯ মহামারী। হতাশ হয়ে কোনেকে কানাডায় ফিরে আসতে হয় এবং দীর্ঘ সময় তিনি কোনো পেশাদার ক্লাব ছাড়াই কেবল সিএফ মন্ট্রিয়াল অনূর্ধ্ব-২৩ দলের সাথে অনুশীলন চালিয়ে যান।

সব বাধা পেরিয়ে কোনে ২০২১ সালে সিএফ মন্ট্রিয়ালের হয়ে প্রথম পেশাদার চুক্তিতে সই করেন এবং দ্রুত নিজেকে এমএলএস-এর অন্যতম সেরা তরুণ বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার হিসেবে প্রমাণ করেন। এরপর ২০২৩ সালে তিনি যোগ দেন ইংলিশ ক্লাব ওয়াটফোর্ডে, যেখানে দলের মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন।

ক্যারিয়ারের গ্রাফ আরও ওপরে তুলে ২০২৪ সালে প্রায় ২৫ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারে তিনি ফরাসি জায়ান্ট অলিম্পিক ডি মার্শেি নাম লেখান। পরে সেখান থেকে রেনে হয়ে ধারে যোগ দেন ইতালিয়ান ক্লাব সাসুলোতে। ইতালিতে দুর্দান্ত পারফর্ম করায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাসুলো তাকে ১৩ মিলিয়ন ইউরোতে স্থায়ীভাবে কিনে নেয়।

কোনে আইভরি কোস্টের হয়ে খেলার সুযোগ থাকলেও কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে বেছে নেন কানাডাকেই। ২০২২ সালের মার্চ মাসে কোস্টারিকার বিরুদ্ধে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। দলের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ৩টি ম্যাচই খেলেন তিনি এবং কানাডা ফুটবলের 'বছরের সেরা তরুণ খেলোয়াড়' নির্বাচিত হন।

তখন মা সুজান দিওমান্দে ছেলেকে নিয়ে বলেছিলেন, 'ও যখন ছোট ছিল, আমি ওকে বলেছিলাম— আমাদের এই কষ্টের দিনগুলো একদিন শেষ হবে। ও আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের সামনে খেলছে, কিন্তু আমার কাছে ও এখনো সেই ছোট ইসমায়েল, যে শুধু আমার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য ফুটবল খেলত।'

২০২৪ কোপা আমেরিকায় কানাডাকে ঐতিহাসিক চতুর্থ স্থান এনে দিতে তিনি বড় ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে ভেনিজুয়েলার বিপক্ষে টাইব্রেকারে তার নেওয়া ষষ্ঠ শটটি কানাডাকে সেমিফাইনালে তোলে। এরপর ঘরের মাঠে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপেও বসনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতেন এই মিডফিল্ডার।

১৮ জুন, ২০২৬ তারিখে কাতারের বিরুদ্ধে কানাডার দ্বিতীয় গ্রুপ পর্বের ঐতিহাসিক ৬-০ জয়ের ম্যাচে এক চরম দুর্ঘটনার শিকার হলেন কোনে। ম্যাচের ৫৭তম মিনিটে কাতারের অসীম মাদিবোর একটি ভয়াবহ ট্যাকলে কোনের পা ভেঙে যায়। যন্ত্রণায় লুটিয়ে পড়া কোনেকে স্ট্রেচারে করে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েন ইসমায়েল কোনে।

ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর