[email protected] রবিবার, ১৯শে জুলাই ২০২৬
৪ঠা শ্রাবণ ১৪৩৩

ক্যালচিনের স্পাইডার থেকে আর্জেন্টাইন নায়ক-জুলিয়ান আলভারেজের অবিশ্বাস্য উত্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০২৬ ০৯:০৭ এএম

যখন তার অনেক সতীর্থ ইংরেজি শেখা, টেনিস অনুশীলন কিংবা বিশ্রামের জন্য বাড়ি ফিরে যেত, তখন জুলিয়ান আলভারেজের মাথায় ঘুরত একটাই চিন্তা, ফুটবল।

কোচ রাফায়েলের কাছ থেকে কয়েকটি বল নিয়ে শুরু করতেন নিজের অনুশীলন। বাম দিক থেকে ক্রস নিয়ে বাঁ পায়ে ফিনিশিং, ডান দিক থেকে ডান পায়ে শট, ফ্রি-কিক, পেনাল্টি, বিভিন্ন কোণ থেকে হেড, স্প্রিন্ট, ড্রিবলিং এবং দুই পায়ের প্রথম স্পর্শের অনুশীলন। সবই করতেন নিঃশব্দে, কোনো বাড়তি প্রচার ছাড়াই। আর এসব শুরু হয়েছিল তার দশ বছর পূর্ণ হওয়ারও আগে।

আর্জেন্টিনার কর্দোবা প্রদেশের ছোট্ট শহর ক্যালচিন। মাত্র সাড়ে তিন হাজার মানুষের বসতিতে বেড়ে ওঠেন আলভারেজ। কোনো বেতন ছিল না, ফুটবল যে একদিন পেশা হবে তারও নিশ্চয়তা ছিল না। তবু তিনি অনুশীলন করতেন, প্রতিযোগিতা করতেন এবং চিন্তা করতেন একজন পেশাদার ফুটবলারের মতো।

পরিশ্রমী পরিবারে বেড়ে ওঠা আলভারেজ ছিলেন লাজুক ও শান্ত স্বভাবের। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তার উত্তর কখনো বদলায়নি, ‘আমি ফুটবলার হতে চাই।’

মাত্র দুই বছর বয়স থেকেই বড় ভাই আগুস্তিন ও রাফায়েলের সঙ্গে ফুটবল স্কুল ফুতুরাস এসত্রেয়িতাসে যাওয়া শুরু করেন তিনি। অন্য শিশুরা যখন বিরক্ত হয়ে পড়ত, তখন ছোট্ট জুলিয়ান নিজের চেয়েও বড় একটি বল খুঁজে নিয়ে খেলায় মেতে উঠতেন।

তার মা মারিয়ানা ছিলেন একটি নার্সারি স্কুলের শিক্ষিকা এবং বাবা গুস্তাভো প্রথমে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে ট্রান্সপোর্টে কাজ শুরু করেন। ব্যস্ত বাবা-মায়ের কারণে দাদি টিটাই প্রায়ই তিন ভাইকে ফুটবল অনুশীলনে নিয়ে যেতেন।

শৈশবের কোচ রাফায়েল ভারাস আলভারেস স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘একদিন আমি তার দাদিকে মজা করে বলেছিলাম, এই ছেলেটাই একদিন আমাদের সবাইকে বাঁচাবে। কিন্তু কথাটা বলেছিলাম কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এই শিশুটির অনেক দূর যাওয়ার সামর্থ্য আছে।’

চার থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত ভারাসের অধীনেই ছিলেন আলভারেজ। প্রথমে স্কুল ফুটবলে। পরে ক্লাব অ্যাতলেটিকো ক্যালচিনে। বর্তমানে আলভারেজের সাফল্যের সুফল পেয়েছে তার শৈশবের ক্লাবটিও। রিভার প্লেট, ম্যানচেস্টার সিটি ও অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদে তার স্থানান্তর থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে ক্লাবটি আধুনিক ঘাসের মাঠ, স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থা এবং বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছে।

প্রতিভা খুঁজে বের করার জন্য পরিচিত সান্তা ফে-ভিত্তিক ক্লাব রেনাতো সেজারিনির নজরে চলে এসেছিলেন আলভারেজ। তবে দীর্ঘদিন পরিবার ক্যালচিন ছাড়তে রাজি হয়নি। কারণ তাদের কাছে জীবন মানে ছিল সাইকেল চালানো, প্রকৃতির কাছে থাকা এবং ছোট্ট শহরের শান্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা।

ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলভারেজ বলেন, ‘ক্যালচিনের কথা শুনলেই আমার বন্ধু ও পরিবারের কথা মনে পড়ে। এই শহরই আমার শৈশব। আমি ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত এখানে ছিলাম। সেই সময়গুলো ছিল অসাধারণ, যেগুলো আমি সবসময় মনে রাখব।’

আজ ক্যালচিনের সবচেয়ে বড় পরিচয় আলভারেজ। কিছু পর্যটক শহরে আসেন তার জন্মস্থান দেখতে। আর স্থানীয় ছোট ছেলেমেয়েরা স্বপ্ন দেখে তার মতো হওয়ার। ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের পর তিনি হয়ে উঠেছেন শহরের সবচেয়ে বড় গর্ব।

শৈশবে বন্ধুরা তাকে ডাকত স্পাইডার নামে। লুকোচুরি কিংবা দৌড়ঝাঁপের খেলায় তাকে মনে হতো একসঙ্গে সব জায়গায় উপস্থিত। অসাধারণ ক্ষিপ্রতা আর পরিশ্রমী মানসিকতার কারণে যেন তার সবার চেয়ে বেশি হাত-পা ছিল। সেখান থেকেই জন্ম নেয় স্পাইডার ডাকনামটি।

তবে বিশ্বজয়ী তারকা হওয়ার পরও আলভারেজ রয়ে গেছেন আগের মতোই বিনয়ী। ক্যালচিনের মেয়র ক্লদিও কাওন বলেন, ‘জুলিয়ান যখন বাড়িতে ফেরে, তখন খুব ব্যক্তিগতভাবে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায়। খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো শহর তার বাড়ির সামনে ভিড় জমাত। আর জুলিয়ান এমনই যে, সে সবার জন্য দরজা খুলে দিত।’

ক্যালচিনের মানুষের বিশ্বাস, খেলা শেষে আলভারেজ শেকড়ে ফিরে তাদের সঙ্গেই থাকবেন। সেখানে সে বিশ্বকাপজয়ী তারকা নয়, আলভারেজ তাদেরই একজন।

ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর