[email protected] রবিবার, ১৯শে জুলাই ২০২৬
৪ঠা শ্রাবণ ১৪৩৩

লামিন ইয়ামালের নামের পেছনের গোপন গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০২৬ ০৯:০৭ এএম

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে যখন স্পেনের হয়ে লামিন ইয়ামাল ফ্রান্সের মুখোমুখি হবেন, তখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি চোখ থাকবে এই ১৯ বছর বয়সী বিস্ময় বালকের দিকে। টেলিভিশন পর্দার ওপারে হয়তো এমন দুজন মানুষও তাকিয়ে থাকবেন, যাদের অবদান ছাড়া আজকের এই ‘লামিন ইয়ামাল’ নামটাই হয়তো চেনা হতো না পৃথিবীর। অথচ আজ অব্দি তারা রয়ে গেছেন পর্দার আড়ালে, এক চরম রহস্য হয়ে।

স্প্যানিশ রীতি অনুযায়ী ইয়ামালের নামের শেষ দুটি অংশ এসেছে তার বাবা ও মায়ের বংশ থেকে—নাসরাউই এবং এবানা। আর তার মূল নাম ‘লামিন ইয়ামাল’। পাসপোর্টের পাতায় পুরো নামটা দাঁড়ায়—লামিন ইয়ামাল নাসরাউই এবানা।

আরবি শব্দ ‘আল আমিন’ থেকে এসেছে লামিন, যার অর্থ সৎ বা বিশ্বস্ত। আর ‘জামাল’ শব্দের ভিন্ন রূপ হলো ইয়ামাল, যার অর্থ সৌন্দর্য। মরক্কো থেকে আসা বাবা মুনির নাসরাউই এবং নিরক্ষীয় গিনির মা শিলা এবানার ঘরে ২০০৭ সালের জুলাইয়ে যখন এই শিশুর জন্ম হয়, তখন চারপাশের অভিবাসী পরিবেশে এই নাম দুটি বেশ মানানসই ছিল।

তবে এই নামকরণের পেছনে রয়েছে এক আবেগঘন ও চমৎকার গল্প।

শিলা এবানা যখন মা হন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। চরম অর্থকষ্ট আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়া এই তরুণ দম্পতির পাশে তখন দেবদূতের মতো দাঁড়িয়েছিলেন তাদের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নতুন জীবনের দায়িত্ব সামলাতে এই দুজনই পরিবারটিকে সবচেয়ে বেশি আর্থিক ও মানসিক সহযোগিতা করেছিলেন। সেই দুই বন্ধুর একজনের নাম ছিল ‘লামিন’ আর অন্যজনের নাম ‘ইয়ামাল’। বন্ধুদের এই ঋণ ও ভালোবাসার প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞতা জানাতেই মা-বাবা তাদের সন্তানের নাম রেখেছিলেন ‘লামিন ইয়ামাল’।

এরপরের গল্পটা শুধুই রূপকথার মতো এগিয়ে যাওয়ার। ৫ মাস বয়সে লিওনেল মেসির কোলে চড়ে ছবি তোলা সেই শিশুটি ১২ বছর বয়সে যোগ দেয় বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে। এরপর বার্সার হয়ে লা লিগা এবং স্পেনের হয়ে ২০২৪ সালের ইউরো জয়—সবই এখন ইতিহাস। আজ বার্সেলোনার সাথে তার চুক্তির অঙ্ক বছরে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ইউরো। বিশ্বের নামী-দামী সব ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে এখন তার মুখ।

অথচ এই বিলাসবহুল জীবনের পেছনে জড়িয়ে আছে স্পেনের সবচেয়ে দরিদ্র ও অভিবাসীপ্রধান এলাকা ‘রোকাদোন্ডা’র এক তীব্র সংগ্রামের গল্প। গোল করার পর ইয়ামাল আঙুল দিয়ে যে ‘৩০৪’ সংখ্যাটি ফুটিয়ে তোলেন, তা মূলত তার সেই চেনা মহল্লার পোস্টকোডের শেষ তিনটি সংখ্যা। নিজের অতীত আর মা-বাবার কষ্টকে তিনি কখনোই ভুলে যাননি। এক সাক্ষাৎকারে ইয়ামাল বলেছিলেন, "আমার মা ১৬ বছর বয়সে আমাকে জন্ম দিয়েছেন। আমার বাবা পেটের দায়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে জিনিসপত্র কুড়িয়েছেন, যেন ঘরে আমাদের জন্য খাবারটুকু আনতে পারেন। আমার কাছে এটাই আসল চাপ, campo বা মাঠের ফুটবল কোনো চাপই নয়।"

হয়তো সেই কষ্টের দিনগুলোতে নিঃসর্থভাবে সাহায্য করা লামিন এবং ইয়ামাল নামের দুই বন্ধু আজ নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখতেই ভালোবাসেন। তারা চান না তাদের কারণে এই ফুটবল তারকার ওপর থেকে স্পটলাইট সরে যাক। কিন্তু ১৯ বছর আগে দুই তরুণ মা-বাবার পাশে দাঁড়িয়ে তারা যে উদারতা দেখিয়েছিলেন, তার ফসল আজ বিশ্ব ফুটবলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। মঙ্গলবার রাতের মহাম্যাচে যখন ‘লামিন ইয়ামাল’ নামটা স্টেডিয়ামে প্রতিধ্বনিত হবে, তখন আড়ালে থাকা সেই দুই বন্ধুর বুক নিশ্চয়ই গর্বে ভরে উঠবে।

ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর