ইউরোপে না খেলেও কী ব্যালন ডি’অর জিততে পারবেন মেসি?
লিওনেল মেসি, মাঠে নামলেই যেন তাকে হাতছানি দেয় নতুন নতুন রেকর্ড। নেইমার, এমবাপ্পে, হালান্ড, কেইন— বিশ্বকাপ থেকে একে একে ছিটকে গেছেন সবাই; শুধু টিকে আছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। ব্যাক টু ব্যাক ফাইনাল খেলবেন এই কিংবদন্তি।
পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই আছেন দারুণ ছন্দে, গোল করছেন, করাচ্ছেন। তবে কী এবার আরও একটি ব্যালন ডি’অর জিততে যাচ্ছেন মেসি? তবে ইউরোপের বাইরের লিগে খেলে ব্যালন ডি’অর জেতা কী আসলেই সম্ভব? নাকি এই অসাধ্যকেও সাধন করবেন সর্বকালের সেরা এই মহাতারকা।
ইউরোপের পাট চুকিয়ে লিওনেল মেসি এখন খেলছেন যুক্তরাষ্ট্রের লিগে। কিন্তু বিশ্বকাপে যে পারফর্ম তিনি করছেন, তাতে ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে মেসির। কিন্তু ইউরোপের বাইরে খেলে কী এই পুরস্কার জেতা সম্ভব?
ব্যালন ডি’অরের আয়োজক ও স্বত্বাধিকারী সাময়িকী ফ্রান্স ফুটবল অবশ্য এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নাকচ করে দিচ্ছে না। চলমান ক্লাব বিশ্বকাপের সময় তাদের অফিসিয়াল ব্যালন ডি’অর ওয়েবসাইটের ‘প্রেস রুম’ বিভাগে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী লেখার শিরোনামই ছিল— ‘ইউরোপের বাইরে খেলেও কি ব্যালন ডি’অর জেতা সম্ভব?’
সেই প্রতিবেদনের প্রচ্ছদ ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ছবি। এতে অনেকেই মজার ছলে বলছেন, হয়তো রোনালদো-ভক্তদের জন্য ছোট্ট একটি চমক রাখা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, ফুটবল অঙ্গনে এই প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে লিওনেল মেসিকে ঘিরেই। কারণ, ইউরোপ ছেড়ে ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই বারবার উঠে এসেছে— ইউরোপের বাইরে খেলেও কি বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত এই পুরস্কার জেতা সম্ভব?
ব্যালন ডি’অরের যাত্রা শুরু ১৯৫৬ সালে। প্রথম দিকে এই সম্মাননা ছিল কেবল ইউরোপীয় লিগে খেলা ইউরোপীয় ফুটবলারদের জন্য। পরে ১৯৯৫ সালে নিয়মে বড় পরিবর্তন আনা হয়। তখন বিশ্বের যেকোনো দেশের খেলোয়াড় পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পান, তবে শর্ত ছিল তাকে অবশ্যই ইউরোপের কোনো ক্লাবে খেলতে হবে।
এরও এক যুগ পর, ২০০৭ সালে সেই শর্তও তুলে দেওয়া হয়। এরপর থেকে ব্যালন ডি’অরের যোগ্যতার ক্ষেত্রে ক্লাব বা মহাদেশের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ, একজন ফুটবলার ইউরোপের বাইরে খেললেও, যদি তিনি মূল্যায়ন পর্বে বিশ্বের সেরা পারফর্মার হিসেবে বিবেচিত হন, তাহলে ব্যালন ডি’অর জেতার পথ তার জন্য খোলা।
২০২৩ সালে রেকর্ড অষ্টমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জেতার সময় লিওনেল মেসি ছিলেন মেজর লিগ সকারের ক্লাব ইন্টার মায়ামির খেলোয়াড়। তাই অনেকের কাছেই এটি ইউরোপের বাইরে খেলেও ব্যালন ডি’অর জয়ের উদাহরণ বলে মনে হতে পারে।
তবে বিষয়টির পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে। ২০২২ সাল থেকে ব্যালন ডি’অরের মূল্যায়ন আর জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছর ধরে করা হয় না; বরং একটি পূর্ণ ফুটবল মৌসুমের (সাধারণত আগস্ট থেকে পরবর্তী বছরের জুলাই) পারফরম্যান্সকে ভিত্তি ধরা হয়। ফলে ২০২৩ সালের পুরস্কার নির্ধারণে মেসির পিএসজিতে খেলা, আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো এবং মৌসুমজুড়ে তার পারফরম্যান্সই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল। ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পরের সময়টা তখন মূল্যায়নের খুব ছোট একটি অংশ ছিল।
তাই ২০২৩ সালে ব্যালন ডি’অর জয়ের সময় মেসি ইন্টার মায়ামির খেলোয়াড় হলেও, পুরস্কারটি মূলত নির্ধারিত হয়েছিল পিএসজির হয়ে তার শেষ মৌসুমের পারফরম্যান্স এবং কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতানোর অবদানের ভিত্তিতে।
এরপর চিত্রটা বদলে যায়। ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর ২০২৪ ও ২০২৫— কোনো বছরই ব্যালন ডি’অরের ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পাননি মেসি। শুধু তা-ই নয়, ২০১১ সালে ব্রাজিলের ক্লাব সান্তোসে থাকা অবস্থায় নেইমারের মনোনয়নের পর পুরুষদের ফুটবলে ইউরোপের বাইরে খেলা আর কোনো ফুটবলার ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নিতে পারেননি। অবশ্য নারী ফুটবলে ব্যতিক্রম দেখা গেছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব সিয়াটল রেইন এফসির হয়ে খেলেই ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন মেগান রাপিনো।
টানা তিন মৌসুম মেজর লিগ সকারে খেললেও ৩৯ বছর বয়সী মেসিকে ইউরোপের তারকাদের সঙ্গে ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়ে দেখা যাবে— এমনটা কয়েক মাস আগেও খুব কম মানুষই ভাবতেন। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। টুর্নামেন্টজুড়ে এখন পর্যন্ত মেসির ঝুলিতে রয়েছে ৮ গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট। তার নেতৃত্বেই আর্জেন্টিনা পৌঁছে গেছে ফাইনালে।
স্পেনের বিপক্ষে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচের ফল যাই হোক, বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ জয়ের দৌড়ে মেসিই এখন সবচেয়ে এগিয়ে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও তিনি সবার উপরেই আছেন।
এবারের ব্যালন ডি’অরের মূল্যায়ন হবে ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে। ফলে বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলবে, এতে সন্দেহ নেই। শুধু জাতীয় দলের জার্সিতেই নয়, এই সময়ে ইন্টার মায়ামির হয়েও ধারাবাহিকভাবে গোল করেছেন মেসি।
এই মূল্যায়ন পর্বে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে তার গোলসংখ্যা ইতোমধ্যেই ৪৫। বিশ্বকাপে সম্ভাব্য ব্যক্তিগত অর্জন এবং পুরো মৌসুমের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় নিলে, ক্যারিয়ারের নবম ব্যালন ডি’অর জয়ের লড়াইয়ে মেসিকে শক্তিশালী দাবিদার বলাই যায়।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: