২০৩৪ বিশ্বকাপের সূচি নিয়ে বড় শঙ্কা, ফিফার সামনে কঠিন সমীকরণ
সৌদি আরবে ২০৩৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হতে এখনো প্রায় আট বছর বাকি। তবে টুর্নামেন্টটির আয়োজনের সময়সূচি নির্ধারণ নিয়েই এরই মধ্যে জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র গরমের কারণে কাতার বিশ্বকাপের মতো ২০৩৪ সালের আসরও শীতকালে আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এবার সম্ভাব্য সময়সূচির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়াতে পারে রমজান, শীতকালীন অলিম্পিক ও হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩৪ বিশ্বকাপের সূচি নিয়ে ফিফা এক ধরনের ‘অভূতপূর্ব সংকটের’ মুখোমুখি হতে পারে। কারণ সৌদি আরবে বিশ্বকাপ আয়োজনের সম্ভাব্য শীতকালীন সময় মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আয়োজনের সঙ্গে মিলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০ নভেম্বর থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। একই ধরনের সময়সূচি ২০৩৪ সালে অনুসরণ করা হলে রমজানের সঙ্গে বিশ্বকাপের বড় একটি অংশের সময় মিলে যেতে পারে। ইসলামী বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, ২০৩৪ সালে রমজান শুরু হতে পারে ১২ নভেম্বর এবং শেষ হতে পারে ১২ ডিসেম্বর।
মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় মাস রমজান সৌদি আরবের জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এ সময় দিনের বেলা বিভিন্ন কার্যক্রমের সময়সূচিতে পরিবর্তন আসে। ফলে বিশ্বকাপ আয়োজন করা হলে ম্যাচগুলো রাতের দিকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এতে টুর্নামেন্টের সূচি ও সম্প্রচার পরিকল্পনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বকাপ বছরের শুরুতে আয়োজনের সম্ভাবনাও খুব বেশি নেই। কারণ ২০৩৪ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে শীতকালীন অলিম্পিক আয়োজনের কথা রয়েছে। এরপর মার্চে শুরু হবে হজের প্রস্তুতি। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ২০ লাখ মুসল্লি হজ পালনের জন্য মক্কায় সমবেত হন। সৌদি আরবের জন্য এই ধর্মীয় আয়োজনের সময়সূচি পরিবর্তনের সুযোগও নেই।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবহাওয়ার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। মার্চের পর থেকেই সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ফলে জুন-জুলাইয়ের মতো প্রচলিত সময়ে বিশ্বকাপ আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে ফিফাকে আন্তর্জাতিক লিগ, ক্লাব ফুটবল ও মহাদেশীয় প্রতিযোগিতার সূচির সঙ্গেও সমন্বয় করতে হবে।
পলিটিকোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩৪ সালের বড়দিনের পর থেকে ২০৩৫ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়টি বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য তুলনামূলক বাস্তবসম্মত হতে পারে। তবে বড়দিনের সময় এড়িয়ে চলতে চাইলে ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য হাতে থাকা সময় আরও সংকুচিত হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে ৬৪ দলের বিশ্বকাপ হলে সূচি নির্ধারণের চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অবশ্য বড় ধরনের আয়োজনগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভ্যস্ত। ২০২৬ বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এরপর ২০৩০ বিশ্বকাপও ছয়টি দেশ ও তিনটি মহাদেশে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তাই ২০৩৪ সালের সূচি সংকট সমাধানে ফিফা নতুন কোনো পথ বের করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সম্ভাব্য সূচি পরিবর্তন নিয়ে ইউরোপীয় ফুটবল অঙ্গনেও বিরোধ তৈরি হতে পারে। বিশ্বকাপের সময়সূচি বদলালে ইউরোপের ঘরোয়া লিগ ও ক্লাব প্রতিযোগিতার ক্যালেন্ডারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। এরই মধ্যে ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ইউরোপীয় ফুটবল মহলে অসন্তোষ রয়েছে। ফলে ২০৩৪ বিশ্বকাপের সূচি নিয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত এলে ইউরোপীয় ক্লাব ও ফুটবল সংস্থাগুলোর চাপ বাড়তে পারে।
এর বাইরে সৌদি আরবের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে। কাতার ২০২২ ও রাশিয়া ২০১৮ বিশ্বকাপের মতো সৌদি আরবও মানবাধিকার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে। তবে ফিফার দাবি, বিশ্বকাপকে আরও বৈশ্বিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতেই তারা কাজ করছে।
ইনফান্তিনো আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের প্রচলিত জুন-জুলাই সময়সূচি নিয়ে আরও নমনীয়ভাবে ভাবতে হতে পারে। তার মতে, বিষয়টি শুধু একটি বিশ্বকাপের সূচি নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যালেন্ডারকে সামনে রেখে সমাধান খুঁজতে হবে।
সব মিলিয়ে ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজন নিয়ে এখনো অনেক সময় হাতে থাকলেও সূচি নির্ধারণে ফিফার সামনে এরই মধ্যে কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া, রমজান, হজ, শীতকালীন অলিম্পিক ও ইউরোপীয় ফুটবলের ক্যালেন্ডার—সবকিছুর সঙ্গে সমন্বয় করে শেষ পর্যন্ত ফিফা কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: