[email protected] মঙ্গলবার, ২৮শে জুলাই ২০২৬
১৩ই শ্রাবণ ১৪৩৩

এঁটো বাসন ধোয়া থেকে কমনওয়েলথে রুপো, ঋষিকান্তের জন্য বিশেষ নৈশভোজ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬ ০৯:০৭ এএম

শৈশবে পরিবারের দু’বেলা খাবারের জোগান দিতে অন্যের এঁটো বাসন ধুয়েছেন। নির্মীয়মাণ বাড়িতে জল ভরেছেন। দিনে মাত্র ১৫০ টাকা মজুরিতে কাজ করেছেন। সেই কঠিন দিন পেরিয়ে আজ দেশের হয়ে কমনওয়েলথ গেমসে রুপোর পদক জিতেছেন ভারতের ভারোত্তোলক ঋষিকান্ত সিংহ। তাই তাঁর সাফল্য উদ্‌যাপনে গেমস ভিলেজের নৈশভোজও হয়ে উঠেছিল বিশেষ।

গত রবিবার পুরুষদের ৬০ কেজি ভারোত্তোলনে রুপো জেতার পর ভারতীয় খেলোয়াড় ও কোচেরা নৈশভোজে ঋষিকান্তকে অভিনন্দনে ভরিয়ে দেন। সবার ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে চোখের কোণ ভিজে আসে তাঁর। কয়েক ঘণ্টা আগেই যে তরুণ দেশকে গর্বিত করেছেন, একসময় তাকেই পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ধাবায় থালা-বাসন ধুতে হয়েছে।

ঋষিকান্তের সংগ্রামের শুরু মাত্র ১১ বছর বয়সে। ইম্ফলের কাছের একটি গ্রামের ধাবায় কাজ করে দিনে ১৫০ টাকা উপার্জন করতেন। সেই অর্থে পরিবারের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব না হওয়ায় সন্ধ্যার পর নির্মীয়মাণ বাড়ির ট্যাঙ্কে জল ভরার কাজও করতেন। তাঁর বাবা ট্যাক্সি চালিয়ে যা আয় করতেন, তাতে পরিবারের একবেলার খাবার জুটত। অভাবের সংসারে মায়ের পাতে সবজিও থাকত না।

পদক জয়ের পর সেই দিনগুলোর কথা মনে করে ঋষিকান্ত বলেন, ছোটবেলায় পরিবারের জন্য বাড়তি কিছু টাকা রোজগার করতে ধাবায় কাজ করেছিলেন। মাত্র তিন মাস দৈনিক ১৫০ টাকা মজুরিতে কাজ করলেও সেই অভিজ্ঞতা আজও তাঁর মনে গেঁথে আছে। গেমস ভিলেজের রান্নার কর্মীদের দেখেও নিজের অতীতের কথা মনে পড়ছিল তাঁর। তাঁর কথায়, এই পদক তাঁদের জন্য, যাঁরা জীবনে কোনও সাহায্য পাননি এবং ছোটবেলা থেকেই পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

তবে ঋষিকান্তের জীবনের মোড় ঘুরে যায় মাত্র ১২ বছর বয়সে। অবসর সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন তিনি। এক মেলায় তাঁকে দেখে গ্রামের এক ক্রীড়াশিক্ষকের মনে হয়, রোগা হলেও তাঁর শারীরিক গঠন ভবিষ্যতে একজন ভালো খেলোয়াড় হওয়ার উপযোগী। কয়েক দিন পরই স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার ট্রায়াল ছিল। সেই শিক্ষকের পরামর্শে খুমান লামপাক স্টেডিয়ামে ট্রায়াল দেন ঋষিকান্ত।

প্রাথমিকভাবে বক্সিং ও ভারোত্তোলন—দুই বিভাগেই নির্বাচিত হন তিনি। শেষ পর্যন্ত তৎকালীন প্রধান কোচ ব্রজেন্দ্র সিংহ তাঁকে ভারোত্তোলনের জন্য বেছে নেন। ব্রজেন্দ্রের চোখে তখনই ধরা পড়েছিল ঋষিকান্তের সম্ভাবনা। রোগা শরীর হলেও তাঁর পেশি ছিল শক্তিশালী। তার চেয়েও বড় বিষয় ছিল মনের জোর ও প্রবল ইচ্ছাশক্তি।

মজার বিষয়, ঋষিকান্ত তখনও খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্নে ভারোত্তোলন শুরু করেননি। তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ মানে ছিল খাবারের নিশ্চয়তা। প্রশিক্ষণের সময় অন্তত খাবারের চিন্তা করতে হতো না। এমনকি বাতিল হয়ে যাওয়া বেল্ট ও জুতো সংগ্রহ করে স্থানীয় দোকানে দিয়ে নতুন সরঞ্জাম জোগাড় করতেন তিনি।

কিন্তু ১৮ বছর বয়সে আবারও জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। হতাশ হয়ে খেলা ছেড়ে বাড়ি ফিরে যান ঋষিকান্ত। পরিবারের কাছ থেকেও বিশেষ উৎসাহ পেতেন না। বরং শুনতে হতো, যাঁদের সামর্থ্য আছে তাঁরাই পদক জিততে পারেন—তিনি কীভাবে পারবেন?

ঠিক সেই সময় মণিপুর ভারোত্তোলন সংস্থার তৎকালীন সচিব সুনীল এলাংবাম তাঁর খোঁজ নেন। আর্থিক সমস্যার কারণে অনুশীলনে যেতে পারছেন না শুনে তাঁকে ইম্ফলের ওয়েটলিফটিং সেন্টার ফর এক্সেলেন্সে ট্রায়াল দেওয়ার পরামর্শ দেন। সেই ট্রায়ালে নির্বাচিত হওয়াই ঋষিকান্তের জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁক। তাঁর নিজের ভাষায়, সেই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবন বদলে দেয়।

২০১৯ সালে ৫৫ কেজি বিভাগে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন ঋষিকান্ত। একই বছর কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপেও জেতেন সোনা। সেই সাফল্যের সুবাদে ভারতীয় নৌ সেনায় চাকরি পান তিনি। জীবনে আসে আর্থিক নিরাপত্তা। তবে অতীতকে কখনও ভুলে যাননি এই ভারোত্তোলক।

আজ আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের হয়ে পদক জেতা ঋষিকান্তের লক্ষ্য, সেই পদক বাবা-মা, ভাই-বোনদের হাতে তুলে দেওয়া। গত আট বছর ধরে তাঁরাই তাঁকে সাহস জুগিয়েছেন। আর নিজের কঠিন শৈশবের কথা মনে রেখেই চাকরি পাওয়ার পর থেকে দুঃস্থ ক্রীড়াবিদদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি।

একদিন যে ছেলেকে পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করতে অন্যের এঁটো বাসন ধুতে হয়েছিল, আজ তাঁর পদকজয় উদ্‌যাপনে আয়োজিত হয়েছে বিশেষ নৈশভোজ। ঋষিকান্তের গল্প তাই শুধু একটি রুপোর পদকের গল্প নয়; এটি দারিদ্র্য, সংগ্রাম, প্রত্যয় আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে জয় করে উঠে আসার এক অনুপ্রেরণার গল্প।

ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর