[email protected] শুক্রবার, ৫ই জুন ২০২৬
২১শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ধানের মাঠ থেকে তীর-ধনুকের মঞ্চে: পাকিস্তানের দুই কৃষক আর্চারের স্বপ্নযাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ ২০:১১ পিএম

র‌্যাঙ্কিং রাউন্ড শেষ করে রবিবার শেষ বিকেলে ঢাকা স্টেডিয়ামের অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকে পায়চারি করছিলেন আমান উল্লাহ ও আসিফ মাহমুদ। ঢাকায় চলমান ২৪তম তির এশিয়ান আরচ্যারি চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে প্রথমবার ঢাকায় এসেছেন দুই পাকিস্তানি আর্চার।

আসিফের বাড়ি ফয়সালাবাদ। আমান উল্লাহর মুলতান। নিতান্ত শখের বশেই আর্চারি খেলেন এই দুজন। আসিফ মাত্র বছর তিনেক আগে আর্চারি খেলা শুরু করেছেন। আমান খেলছেন পাঁচ বছর।


খেলোয়াড় হলেও মূলত তাদের বড় পরিচয় দুজনই কৃষক। স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে আমান উল্লাহ বলছিলেন, “আমরা আসলে পাঞ্জাবের কৃষক। খেতে খামারে কাজ করি। দুজনেরই পেশা কৃষিকাজ। আমাদের ধান, গম, ভুট্টা, আখের জমি আছে। এগুলো বেশি চাষ হয় আমাদের ওখানে। বেশিরভাগ সময় মাঠে কাজ করি। এর ফাঁকে ফাঁকে আর্চারি অনুশীলন করি।”


পাকিস্তান থেকে তিন জন আর্চার এসেছেন ঢাকায়। আরেকজন রিজওয়ান ফাহিম। মাত্র ৫০ দিনের অনুশীলনে ঢাকা এসেছেন বলে জানালেন আসিফ। অল্প অনুশীলনে বড় মঞ্চে যে নিজেদের মেলে ধরতে পারেননি সেটা স্কোরবোর্ডেই প্রমাণ।


তিন জনই অংশ নিয়েছেন পুরুষ রিকার্ভ ইভেন্টে। যেখানে ৬২ জনের মধ্যে ৫৩তম হয়েছেন আমান উল্লাহ। স্কোর করেছেন ৫৮৮। আর আসিফ মাহমুদ ৫৭৯ স্কোর করেছেন। তিনি হয়েছেন ৫৭তম।


পাকিস্তানে আর্চারি মোটেও জনপ্রিয় খেলা নয়। সব মিলিয়ে ৫০০ আর্চার সে দেশে নিয়মিত আর্চারি খেলেন। পাকিস্তান আর্চারি ফেডারেশনও খেলাটি জনপ্রিয় করার কোনও উদ্যোগ নেয় না বলে জানালেন আমান, “আসলে আমাদের ফেডারেশন কখনোই ভাবে না আর্চারিটা উন্নতি হোক। আমাদের অবস্থা দেখেই নিশ্চয় তা বুঝতে পারছেন।”


প্রথমবারের মত ঢাকা এসে উচ্ছ্বসিত আসিফ। তিনি বলেন , “করাচি ও ঢাকার মধ্যে কোনও তফাত নেই। আমার তো মনে হচ্ছে করাচিতেই আছি। ট্রাফিক ও জনসংখ্যাও মনে হয় একই রকম হবে। তবে বাংলাদেশের মানুষ খুব ভালো। অতিথিপরায়ণ। আর আমরা তো ভাই ভাই। যখন কোনও ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের দেখা হয় তখন তো ভালোই লাগে। ”


পাকিস্তানে ক্রিকেট জনপ্রিয়। এরপরই হকি। কিন্তু এত খেলা থাকতে কেন তির ধনুকের প্রেমে পড়লেন? এমন প্রশ্নের জবাবে আসিফ হেসে বলেন, “ আমি ইন্টারনেটে একদিন আর্চরি খেলা দেখে এটা ভালো লেগে যায়। এরপর আমার ওস্তাদ যখন আমাকে বলে, তখন খেলাটা শিখি। এখানে প্রথমবার এসে হয়তো ভালো করিনি। পরের বার সোনা জিতব।”


আমান যোগ করেন, “আমাদের নবী করিমের সুন্নত এটা। আমরা মুসলিম। সেই সুন্নতের কথা ভেবেই আর্চারি খেলি আমি।”


পাকিস্তানে যতোই খেলাটা অজনপ্রিয় হোক না কেন একদিন তির ধনুকে অলিম্পিকে খেলতে চান। আমান বলছিলেন সেটাই, “একদিন আমরা অলিম্পিকে সোনা জিতব। এটা আমাদের স্বপ্ন। সেই চেষ্টা করব আমরা। তবে সেক্ষেত্রে পাকিস্তানি আর্চারি ফেডারেশন যদি সমর্থন দেয় আর কোচ যদি আমাদের ওপর ভরসা করে তাহলে ইনশাল্লাহ একদিন অলিম্পিক থেকে পদক নিয়ে আসব।”


পাকিস্তানের মুলতান আর ফয়সালাবাদের মাঠে দিনরাত ফসল ফলানো এই দুই কৃষক এখন তীর ধনুকে স্বপ্ন বুনছেন। স্কোরবোর্ডে সাফল্য না থাকলেও তাদের চোখে আছে অদম্য জেদ, বিশ্বাস আর নিজের সীমা পেরোনোর ইচ্ছা। ক্রিকেটপ্রেমী এক দেশে আর্চারিকে ভালোবেসে তারা দেখিয়ে দিয়েছেন—মঞ্চ ছোট হোক বা বড়, স্বপ্নের আকাশ সবার জন্যই সমান বিস্তৃত। একদিন হয়তো সত্যিই কোনো অলিম্পিক মাঠে ওদের তীর গিয়ে লাগবে সোনার নিশানায়।

ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর