জাহানারার অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন বিসিবির হাতে
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অভিজ্ঞ পেসার জাহানারা আলমের আনা মানসিক নির্যাতন ও যৌন হেনস্তার অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন অবশেষে হাতে পেয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দীর্ঘ সময় ধরে চলা তদন্ত কার্যক্রম শেষে নির্ধারিত সময়ের দুদিন পর প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
জাহানারার অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত বছর বিসিবি প্রথমে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিতে ছিলেন বিসিবি পরিচালক রুবাবা দৌলা, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি তারিক উল হাকিম এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা।
পরবর্তীতে তদন্তকে আরও বিস্তৃত ও নিরপেক্ষ করতে কমিটিতে আরও দুজন সদস্য যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় বিসিবি। এতে যুক্ত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমানে বাংলাদেশ আইন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. নাইমা হক এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান খান। ফলে তদন্ত কমিটির সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচ জনে।
তদন্ত কমিটি গঠনের পর একাধিকবার প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময়সীমা বাড়ানো হয়। বিসিবির পক্ষ থেকে গত ২ ডিসেম্বরের মধ্যে জাহানারাকে লিখিত অভিযোগ দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়। তবে লিখিত অভিযোগ প্রস্তুতের জন্য সময় চেয়ে নিলে তাকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়া হয়। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩১ জানুয়ারি।
যদিও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে ২ ফেব্রুয়ারি তদন্ত কমিটির সদস্যরা প্রতিবেদন বিসিবির কাছে জমা দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা। বিসিবিও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের অক্টোবরে একাধিক সাক্ষাৎকারে জাহানারা নারী দলের অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুললেও বিসিবি সেগুলোকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয়। তবে ৬ নভেম্বর ফ্রিল্যান্স ক্রীড়া সাংবাদিক রিয়াসাদ আজিমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে আনেন।
সেই সাক্ষাৎকারে জাহানারা আলম অভিযোগ করেন, সাবেক কোচ মঞ্জুরুল ইসলাম এবং নারী বিভাগের তৎকালীন ইনচার্জ প্রয়াত তৌহিদ মাহমুদের কাছ থেকে তিনি মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, বিষয়টি বিসিবিকে জানানো হলেও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি। বাধ্য হয়েই তিনি প্রকাশ্যে এসে অভিযোগ তুলেছেন বলে দাবি করেন।
এই অভিযোগ সামনে আসার পরই বিসিবি তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়।
এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার দিনই জাহানারার অভিযোগের বিষয়ে বিসিবির নীরবতা কেন আইনগতভাবে অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি আহমদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এই রুল জারি করা হয়।
রিট আবেদনের শুনানি শেষে আইনজীবীরা জানান, নারী ক্রিকেটারের অভিযোগের বিষয়ে বিসিবির যে নির্লিপ্ততা ও নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেছে, তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না সে বিষয়ে বোর্ডকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিসিবিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, জাহানারার অভিযোগের পর কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বা ভবিষ্যতে কী নেয়া হবে, সে বিষয়ে আদালতকে অবহিত করতে।
রিট আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যদি নিশ্চুপ থাকে, তাহলে শুধু একজন ভুক্তভোগীই নয় ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আরও ভুক্তভোগীরাও ভয়ে বা অনাস্থার কারণে সামনে আসতে সাহস পান না। এতে ন্যায়বিচার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পাশাপাশি নারী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে আদালতের কাছে।
এখন তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিসিবি কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং আদালতের নির্দেশনার আলোকে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় সেদিকেই তাকিয়ে আছে দেশের ক্রীড়াঙ্গন।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: