ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির বাংলাদেশ ভ্রমন
বেকেনবাওয়ার, পেলে, ম্যারাদোনা, জিনেদিনে জিদানে এবং হাল আমলের বিশ^ তারকা লিওনেল মেসি- সবার হাতেই শোভা পেয়েছিল ফিফা বিশ^কাপের সোনালী ট্রফিটা। ঝাঁ চকচকে সেই ট্রফিই চতুর্থবারের মতো এলো ঢাকায়। এর আগে ২০০২, ২০১৩ ও ২০২২ সালে ঢাকায় এসেছিল এই ট্রফি।
আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ভারত হয়ে বুধবার সকাল ১০টায় চার্টার্ড বিমানে করে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে এসে পৌঁছে ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের পাঁচ কেজি ওজনের এই বিশ^কাপ ট্রফিটি। সঙ্গে এসেছেন ২০০২ বিশ্বকাপ জয়ী ব্রাজিলের ফুটবলার গিলবার্তো সিলভাও। কয়েক ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশে এসে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কালো পর্দা উঠিয়ে ট্রফি উন্মোচন করেন ব্রাজিলিয়ান এই সাবেক তারকা। পাশেই ছিলেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া।

প্রথমবার ট্রফি সামনে থেকে দেখে রোমাঞ্চিত এই মিডফিল্ডার, ‘অভিজ্ঞতা অনেক ভালো ছিল। গিলবার্তো এসেছে ট্রফির সঙ্গে। এটা আমার সামনে থেকে দেখা প্রথম ট্রফি। অনেক ভালো লাগছে। সামনের দিকে সম্ভবত বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মদের জন্য বিশ্বকাপ একটা অধ্যায়।’ তিনি যোগ করেন, ‘আমি ভেবেছিলাম বিশ্বকাপ ট্রফি খুব ছোট, কিন্তু এখন দেখি আসলেই এটা অনেক বড়। জিজ্ঞেস করে দেখলাম সাত কেজি শুধু সোনাই আছে। এই ট্রফি সবার জন্য অনুপ্রেরণা, সবাই আরও উজ্জীবিত হবে।’ ২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা শুনিয়েছেন জামাল, ‘২০০২ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতেছে, তখন আমার বয়স ১২। রোনালদো, কাফু, রিভালদো ছিলেন ওই দলে। গিলবার্তোও ছিলেন। আমাকে অনেক উজ্জীবিত করেছেন তারা। আর এই ট্রফি টিভিতে দেখা এক কথা আর সামনে থেকে আরেক কথা। সামনে আরও একটি বিশ্বকাপ আসছে। আমি চাইবো আমার জন্মস্থান ডেনমার্ক ট্রফি জিতুক। নাহলে ব্রাজিল জিতুক।’

ব্রাজিলের ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী মিডফিল্ডার গিলবার্তো সিলভা বলেন, ‘বাংলাদেশে এসে আমি সত্যিই দারুণ আনন্দিত। এটাই আমার প্রথম বাংলাদেশ সফর। এত উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ। ফিফার পক্ষ থেকে, আমাদের সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, কোকা-কোলা, সবাইকে ধন্যবাদ আমাদের এমন সুন্দরভাবে আতিথেয়তা করার জন্য।’ ব্রাজিলিয়ান এই মহাতারকা যোগ করেন, ‘এই সময়টা সত্যিই খুব বিশেষ। বাংলাদেশে এসে বিশ্বকাপের আসল ট্রফিটি নিয়ে আসা- এই আইকনিক ট্রফি, এটা ভীষণ অনুপ্রেরণাদায়ক। আজও যখনই আমি এই ট্রফিটিকে কাছ থেকে দেখি, ঠিক যেমন এখন দেখছি, তখন আবার নতুন করে অনুপ্রাণিত হই। এটা আমাকে আজও সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। ফুটবলকে যতটা সম্ভব উপভোগ করতে শেখায়, এবং একই সঙ্গে ‘সুন্দর খেলাটির’ একজন দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে উৎসাহ দেয়। ফিফা ও পুরো দলের সঙ্গে এখানে এসে এই ট্রফি নিয়ে আসতে পারা আমাদের জন্য বিরাট সম্মানের।’
বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে গিলবার্তো বলেন, ‘আমি আশা করি, এই ট্রফি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলার দিকে, বিশেষ করে ফুটবলের দিকে আরও বেশি আগ্রহী করবে-যে খেলাটিকে আমরা হৃদয় থেকে ভালোবাসি।’
বাফুফের সহ-সভাপতি সাব্বির আহমেদ আরেফ আশাবাদী কণ্ঠে জানালেন, ‘এই স্পিরিট অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই সামর্থ্য (বিশ্বকাপে খেলা) এখনও আমাদের হয়নি। আমরা বিশ্বকাপে যাবো এখন না হলেও কোনও এক প্রজন্মে যাবে। বাংলাদেশ কোনও না কোনও সময় একদিন বিশ্বকাপ খেলবে।’
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘আজ সত্যিই একটি অসাধারণ সকাল। কারণ ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি আবারও বাংলাদেশে এসেছে। আর এই ট্রফির সঙ্গে এসেছেন এমন একজন কিংবদন্তি, যাঁকে আমরা এতদিন টিভির পর্দায় দেখেছি, আর আজ সামনে থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছি। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ফুটবলপ্রেমী জনগোষ্ঠী ও প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আমরা ফিফাকে ধন্যবাদ জানাই। কোকা-কোলাকে ধন্যবাদ, বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে এত বিশাল আকারে লজিস্টিকস ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা করার জন্য। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে বিশেষ ধন্যবাদ, সবকিছু এত সুন্দরভাবে আয়োজন করার জন্য। এবং অবশ্যই ধন্যবাদ আমাদের সকল সমর্থককে-যাঁরা সরাসরি এবং অনলাইনে আমাদের সঙ্গে রয়েছেন।’ বাফুফে সভাপতি যোগ করেন, ‘ফুটবল এমন একটি খেলা, যা মানুষকে এক করে। এটি শান্তি ও স্থিতিশীলতার বার্তা বহন করে। ভাষা, সংস্কৃতি, জাতি ও ধর্মের সব বিভাজন অতিক্রম করে ফুটবল আমাদের এক করে দেয়। এই বিশ্বকাপ ট্রফির উপস্থিতিতে, আসুন আমরা একটি নতুন সূচনা করি। একটি আরও সুন্দর, আরও স্মরণীয় এবং আরও দুর্দান্ত বিশ্বকাপের পথে।’
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর কথা, ‘বিশ্বকাপজয়ী গিলবার্তো সিলভা এবং আজ যারা বাংলাদেশে পা রেখেছেন, আপনাদের সবাইকে শুভ সকাল ও বাংলাদেশে স্বাগতম। আজ আমাদের দেশের জন্য সত্যিই একটি গর্বের দিন। শুধু বিশ্বকাপ ট্রফি এখানে এসেছে বলে নয়- বরং এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে বিভাজন ও অস্থিরতার অনুভূতি কাজ করছে—ফুটবলই এমন একটি খেলা, যা পুরো পৃথিবীকে একসূত্রে বেঁধে রাখে। কোকা-কোলার উদ্যোগে সেই প্রতীকি বিশ্বকাপ ট্রফি আজ বাংলাদেশে এসেছে, আর আমাদের তরুণ প্রজন্ম খুব কাছ থেকে এই ঐতিহাসিক ট্রফিকে দেখার সুযোগ পাচ্ছে—এটা সত্যিই অসাধারণ অভিজ্ঞতা।’ তিনি যোগ করেন, ‘আমি শুধু বাংলাদেশের সরকারের প্রতিনিধি নই, ব্যক্তিগতভাবেও আমি একজন ফুটবলপ্রেমী। নিজের দেশের ফুটবল দলের বড় সমর্থক। তবে গিলবার্তো, আপনি জানেন কি না জানি না- বিশ্বকাপ এলেই এই দেশ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়! পরিবারে পরিবারে তর্ক শুরু হয়-ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা। আমি অবশ্য ব্রাজিল শিবিরে, তাই আজ একজন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নিতে পেরে খুবই আনন্দিত।’

আশিক চৌধুরী বলেন, ‘ফুটবল এ দেশের সবচেয়ে বড় আবেগের নাম। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ফুটবলে আমরা নতুন জাগরণ দেখছি। বিশেষ করে আমাদের নারী ফুটবল দল অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। তারা এএফসি উইমেন্স ফুটবল টুর্নামেন্টে কোয়ালিফাই করেছে—যা আমাদের জন্য বিশাল গর্বের। এখন দায়িত্ব ছেলেদের দলের প্রমাণ করার যে তারাও নারীদের মতোই সক্ষম। আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন বাংলাদেশ জাতীয় দল প্রমাণ করবে- কোনো দেশই এত ছোট নয় যে বিশ্বকাপ জিততে পারবে না। আশা করি, একদিন বাংলাদেশও এই ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে। আজকের এই সফর আমাদের তরুণদের সেই স্বপ্ন দেখার সাহস দিক।’
কোকা-কোলা বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মইনুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘দশকের পর দশক ধরে কোকা-কোলা ও ফিফা ফুটবলের সেই অসাধারণ শক্তিতে বিশ্বাস করে আসছে। যে শক্তি মানুষকে সংস্কৃতি, সীমান্ত ও প্রজন্মের ঊর্ধ্বে গিয়ে এক করে। প্রায় ৫০ বছর ধরে কোকা-কোলা গর্বের সঙ্গে ফিফা বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত। যা উৎকর্ষ, স্বপ্ন ও বৈশ্বিক সংযোগের প্রতীক। ২০২২ সালের সফল আয়োজনের পর আবারও ফিফা বিশ্বকাপের আসল ট্রফি বাংলাদেশে নিয়ে আসা, এটা দেশের ফুটবলপ্রেম ও খেলাটির সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর আবেগী সম্পর্কের স্বীকৃতি। এই মুহূর্তটি বাংলাদেশের সমর্থকদের ফুটবল ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করছে, এবং একই সঙ্গে বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর আবেগের অংশ করে তুলছে। আমরা গর্বিত। বাংলাদেশি সমর্থকদের জন্য জীবনে একবার পাওয়া যায় এমন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পেরে। এটা এমন এক জাদুকরী অভিজ্ঞতা, যা শুধু কোকা-কোলাই দিতে পারে।’
এবার বিশ^কাপ ট্রফি দেখার সুযোগ পাননি সাধারন দর্শকরা। কারণ ট্রফি উন্মুক্ত রাখা হয়নি। গত ২০২২ সালের মতো আর্মি স্টেডিয়ামে কনসার্ট বা বড় কোনও প্রদর্শনী ছিল না। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সংক্ষিপ্ত আয়োজন রাখা হয়। কেবল কোকা-কোলার ‘আন্ডার দ্য ক্যাপ’ ক্যাম্পেইনের নির্দিষ্ট বিজয়ী সাতশ’ জন ট্রফির সঙ্গে ছবি তুলেছেন বিকালে। জানা গেছে, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এবং ক্লাব সংশ্লিষ্ট দেড়শ’জন বিশ্বকাপ ট্রফি দেখার সুযোগ পেয়েছেন রেডিসন ব্লুতে গিয়ে। ট্রফি আজও থাকছে ঢাকায়। তবে ভারত থেকে ঢাকায় আসায় ট্রফি আজ রাতেই ঢাকা ছেড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পথে উড়াল দেবে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি।
ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের এবারের আসর হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল বিশ্বকাপ। প্রথমবারের মতো এই টুর্নামেন্ট হবে তিনটি দেশে (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা)। আগামী ১১ জুন আসর শুরু হয়ে শেষ হবে ১৯ জুলাই। অংশ নেবে ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪৮টি দেশ।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: