[email protected] শুক্রবার, ৫ই জুন ২০২৬
২১শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ছোট মাঠের বড় খেলা: ফুটসাল

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০১ এএম

ফুটবল সাধারণত খোলা আকাশের নিচে বড় ঘাসের মাঠে (প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম) খেলা হয়। অন্যদিকে, ফুটসাল একটি ইনডোর বা অভ্যন্তরীণ খেলা, যা জিমনেশিয়াম বা হলের শক্ত কাঠের বা কৃত্রিম ফ্লোরে খেলা হয়। ফুটসালের মাঠ ফুটবলের তুলনায় অনেক ছোট।

 

ফুটসাল কী

ফুটসাল (Futsal) হলো ফুটবলের একটি ইনডোর বা অভ্যন্তরীন সংস্করণ, যা সাধারণত শক্ত কোর্টে খেলা হয়। এটি ফুটবলের তুলনায় অনেক বেশি গতিময় ও কৌশলী খেলা।

‘ফুটসাল’ শব্দটির উৎপত্তি যেভাবে

‘ফুটসাল’ শব্দটি এসেছে স্প্যানিশ শব্দ ‘Fútbol sala’ বা পর্তুগিজ ‘Futebol de salão’ থেকে। Fútbol/Futebol শব্দের অর্থ ফুটবল, আর Sala/Salão অর্থ ইনডোর বা হলরুম। সহজ অর্থে, এটি হলো ‘ইনডোর বা হলরুমের ফুটবল’।

ফুটবল বনাম ফুটসাল: মূল পার্থক্য কী

যদিও ফুটসাল ফুটবলেরই একটি রূপ—তবে এর নিয়মে বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যা খেলা দুটির গতি ও কৌশলে ভিন্নতা তৈরি করে।

মাঠ ও পরিবেশ: ফুটবল সাধারণত খোলা আকাশের নিচে বড় ঘাসের মাঠে (প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম) খেলা হয়। অন্যদিকে, ফুটসাল একটি ইনডোর বা অভ্যন্তরীণ খেলা, যা জিমনেশিয়াম বা হলের শক্ত কাঠের বা কৃত্রিম ফ্লোরে খেলা হয়। ফুটসালের মাঠ ফুটবলের তুলনায় অনেক ছোট।

খেলোয়াড় ও বদল: ফুটবলে প্রতি দলে ১১ জন করে খেলোয়াড় মাঠে নামেন এবং বদলি খেলোয়াড় হিসেবে সাধারণত ৫ জনকে নামানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু ফুটসালে প্রতি দলে মাত্র ৫ জন করে খেলোয়াড় খেলেন। ফুটসালের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘ফ্লাইং সাবস্টিটিউশন’ বা আনলিমিটেড বদল। অর্থাৎ, খেলা চলাকালীন যেকোনও সময় কোচ যতবার খুশি খেলোয়াড় পরিবর্তন করতে পারেন।

বলের প্রকৃতি: ফুটসালে ব্যবহৃত বলটি ফুটবলের ৪ নম্বর সাইজের বলের সমান হলেও এটি ওজনে কিছুটা ভারী হয়। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—এই বলটি ‘লো বাউন্স’ বা কম লাফায়। বলটি ভারী হওয়ায় খেলোয়াড়রা ছোট জায়গায় সহজেই এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন।

সময় ও নিয়ম: ফুটবলের ম্যাচ হয় ৯০ মিনিটের, যেখানে ঘড়ি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে। কিন্তু ফুটসালে ২০ মিনিট করে দুই অর্ধে মোট ৪০ মিনিট খেলা হয়। তবে এখানে ‘স্টপ ক্লক’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়; অর্থাৎ যখনই বল মাঠের বাইরে যায় বা ফাউল হয়, তখন ঘড়ি থামিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া ফুটবলে অফসাইড থাকলেও ফুটসালে কোনও অফসাইড নিয়ম নেই।

থ্রো-ইন ও কিক-ইন: ফুটবলে বল মাঠের সাইডলাইন দিয়ে বাইরে গেলে হাত দিয়ে ‘থ্রো-ইন’ করতে হয়। ফুটসালে হাতের ব্যবহার নেই বললেই চলে, এখানে সাইডলাইন থেকে বল ভেতরে পাঠাতে পা দিয়ে ‘কিক-ইন’ করতে হয়।

এই পার্থক্যগুলোর কারণেই ফুটসাল অনেক বেশি দ্রুতগতির এবং খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত কারিগরি দক্ষতা ও অল্প জায়গায় বল নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

ফুটসালের ইতিহাস

ফুটসালের যাত্রা শুরু হয় ১৯৩০ সালে উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে। শিক্ষক হুয়ান কার্লোস সারিয়ানি যুবকদের জন্য ফুটবলের একটি ছোট সংস্করণ তৈরি করেন, যা ইয়ং মেনস ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (ওয়াইএমসিএ) হলরুমে খেলা যেতো। ১৯৫০-এর দশকে এটি ব্রাজিল ও দক্ষিণ আমেরিকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়নশিপ

১৯৮৯ সালে ফুটসাল ফিফার অধীনে চলে আসে। প্রতি ৪ বছর অন্তর ‘ফিফা ফুটসাল বিশ্বকাপ’ অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। বিশ্বকাপ ফুটবলে ‘হেক্সা’ মিশন সম্পন্ন না করতে পারলেও ফুটসালে তারা সবচেয়ে বেশি ৬ বার শিরোপা জিতেছে। প্রতি তিন, চার বা পাঁচ বছর পর পর ফুটসালের আসর বসে।

এশিয়া অঞ্চলে এএফসি নিয়মিত এশীয় ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করে। আর এতে সবচেয়ে সফল দল ইরান—তারা সর্বোচ্চ ১৩ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও সাম্প্রতিক সাফল্য

বাংলাদেশে ফুটসালের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা খুব বেশি দিনের নয়। তবে এ দেশের ফুটবলারদের সহজাত ড্রিবলিং ক্ষমতা এবং ছোট জায়গায় বল নিয়ন্ত্রণের মৌলিক দক্ষতা থাকায় তারা এই দ্রুতগতির সংস্করণের সাথে খুব দ্রুত মানিয়ে নিয়েছে। গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক আঙিনায় বাংলাদেশের পদচারণা এবং বিশেষ করে নারী দলের সাফল্য দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যোগ করেছে।

বাংলাদেশ জাতীয় পুরুষ ফুটসাল দলের আন্তর্জাতিক অভিষেক ঘটে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। তবে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এই পথে অনেকটা এগিয়ে ছিল। ২০১৮ সালেই এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ফুটসালের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের নারীদের অভিষেক ঘটে।

নেপালে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক সাফ উইমেন’স ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ নারী দল অভাবনীয় নৈপুণ্য দেখিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ফাইনালে মালদ্বীপকে হারিয়ে তারা প্রমাণ করেছে, ছোট পরিসরের কৌশলী ফুটবলেও তারা সেরা।

 

ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর