ইকুয়েডরের বিপক্ষ ১৫ সেভ করা কে এই কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক রুম
কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে গত রাতে যেন এক অসম লড়াইয়ের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব।
একদিকে ইকুয়েডরের একের পর এক বিধ্বংসী আক্রমণ, অন্যদিকে কুরাসাও গোলরক্ষক ইলোই রুমের অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ। ম্যাচের পরিসংখ্যান বলছে ইকুয়েডরের আধিপত্যের কথা, কিন্তু স্কোরবোর্ড বলছে অন্য গল্প। গোলশূন্য ড্রয়ে শেষ হওয়া ম্যাচে ইকুয়েডরকে রুখে দিয়ে একক বীরত্বে শিরোনামে উঠে এসেছেন ৩৭ বছর বয়সী কুরাসাও গোলরক্ষক ইলোই রুম।
ম্যাচে ৬৫ শতাংশ বল দখলে রেখে ইকুয়েডর যেন গোলপোস্টের সামনে ঝড় তুলেছিল। ২৮টি শটের মধ্যে ১৫টিই ছিল লক্ষ্যে। কিন্তু ইকুয়েডরের সব আক্ষেপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রুম। মাত্র তৃতীয় মিনিটেই এনার ভ্যালেন্সিয়ার নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে জানান দিয়েছিলেন, আজ কোনো বলই তাকে পরাস্ত করতে পারবে না। গঞ্জালো প্লাতার হেড হোক কিংবা অ্যাঞ্জেলো প্রেসিয়াদোর শেষ মুহূর্তের ক্রস সবই যেন গ্লাভসে বন্দি করেছেন এই ডাচ-কুরাসাওয়ান গোলরক্ষক।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক ম্যাচে ১৫টি সেভ বিরলতম ঘটনা। ১৯৬৬ সাল থেকে হিসাব করলে অতিরিক্ত সময় ছাড়া কোনো ম্যাচে এটিই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড। ২০১৪ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের টিম হাওয়ার্ড ১৬টি সেভ করেছিলেন, যার মধ্যে চারটি ছিল অতিরিক্ত সময়ে। সেই হিসেবে ইলোই রুমের আজকের পারফরম্যান্স বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত প্রদর্শনী হিসেবেই গণ্য হবে।
প্রথম ম্যাচে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইকুয়েডরের বিপক্ষে এই ড্র কুরাসাওয়ের জন্য বড় স্বস্তির। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম পয়েন্ট অর্জন করেই তারা ফুটবল মানচিত্রে এক উজ্জ্বল অধ্যায় লিখল। ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের ২৫ জনই নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়, যাদের অভিজ্ঞ ডাচ কোচ ডিক অ্যাডভোকাট সুনিপুণভাবে সাজিয়েছেন ইকুয়েডরের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে।
ইলোই রুমের ফুটবল জীবনটাও সিনেমার গল্পের চেয়ে কম নয়। নেদারল্যান্ডসের নিমেগেন শহরে জন্ম নেয়া রুমের ক্যারিয়ার শুরু হয় বিখ্যাত ক্লাব ‘ভিতেসে’র একাডেমিতে। ১৫টি মৌসুম কাটানোর পর খেলেছেন পিএসভি আইন্দহোভেনের মতো পরাশক্তি ক্লাবে। ডাচ লিগ জয় কিংবা ‘কেএনভিবি কাপ’ সব স্বাদই পেয়েছেন তিনি।
২০১৫ সালে শিকড়ের টানে আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্য বেছে নেন কুরাসাওকে। এরপর থেকে দেশের ফুটবল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ তিনি। ২০১৭ সালে কুরাসাওয়ের প্রথম ‘ক্যারিবীয় কাপ’ জয়ে গোল্ডেন গ্লাভস জয়ী এই গোলরক্ষক এখন লিয়ান্দ্রো বাকুনার সাথে যৌথভাবে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ (৭২টি) ম্যাচ খেলার রেকর্ডধারী।
যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে কলম্বাস ক্রুর জার্সিতে অসাধারণ সব সেভের কারণে ভক্তদের কাছে তিনি পরিচিত ‘বাজপাখি’ নামে। ২০২০ সালে এমএলএস কাপ জেতানো এই গোলরক্ষক বর্তমানে খেলছেন মার্কিন ফুটবলের দ্বিতীয় স্তরের ক্লাব মায়ামি এফসিতে। ৩৭ বছর বয়সে এসেও যেন নিজের অভিজ্ঞতা ও ক্ষিপ্রতার নতুন উচ্চতা দেখাচ্ছেন তিনি।
ম্যাচ শেষে সতীর্থদের আলিঙ্গন আর দর্শকদের করতালিতে যখন মাঠ ছাড়ছিলেন রুম, তখন যেন অ্যারোহেড স্টেডিয়ামের আকাশ-বাতাসে শুধুই তার জয়গান। ইকুয়েডরের জন্য এটি ছিল হতাশার রাত, আর ইলোই রুমের জন্য এক মহাকাব্যিক প্রতিরোধের গল্প।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: