[email protected] রবিবার, ৫ই জুলাই ২০২৬
২১শে আষাঢ় ১৪৩৩

সেঞ্চুরির সামনে স্কালোনি, চোখ এবার সর্বকালের রেকর্ডে

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৩ জুলাই ২০২৬ ১০:০৭ এএম

২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে হতাশাজনক বিদায়ের পর আর্জেন্টিনা জাতীয় দল যখন অনিশ্চয়তা আর আত্মবিশ্বাসের সংকটে ডুবে ছিল, তখন খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেছিলেন যে লিওনেল স্কালোনির হাত ধরেই শুরু হবে দেশটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল অধ্যায়।

অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া সেই অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ মানুষটিই আজ আর্জেন্টিনা ফুটবলের নতুন পরিচয়ের প্রতীক। আর কেপ ভার্দের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে তিনি স্পর্শ করতে যাচ্ছেন কোচ হিসেবে নিজের শততম ম্যাচের মাইলফলক।

২০১৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নিয়ে স্কালোনি এমন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যেখানে সমর্থকদের আস্থার চেয়ে সংশয়ই ছিল বেশি। খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি ছিলেন পরিশ্রমী একজন ডিফেন্ডার, তবে তারকাখ্যাতি ছিল না। কোচিংয়েও বড় কোনো সাফল্যের অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে তখন বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন অনেক সাবেক ফুটবলার, বিশ্লেষক ও সমর্থক।

সেই সময় জাতীয় দল নিয়েও ছিল নানা প্রশ্ন। রাশিয়া বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর লিওনেল মেসির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছিল। কয়েক বছর ধরে বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে হেরে দলটি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে স্কালোনি মেসিকে কেন্দ্র করেই নতুন পরিকল্পনা সাজান। একই সঙ্গে ধীরে ধীরে জাতীয় দলে জায়গা করে দেন একঝাঁক তরুণ ফুটবলারকে। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল, যার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ঐক্য।

অল্প সময়ের মধ্যেই সেই পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখা যায় মাঠে। ২০২১ সালে ব্রাজিলের মাটিতে কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনা ঘোচায় দীর্ঘ ২৮ বছরের আন্তর্জাতিক ট্রফি-খরা। শুধু একটি শিরোপাই নয়, সেই জয় ফিরিয়ে আনে পুরো জাতির আত্মবিশ্বাস। এরপর ২০২২ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। একই বছরের শেষ দিকে কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারিয়ে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আলবিসেলেস্তেরা। পরে আরও একটি কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে স্কালোনির ট্রফির সংখ্যা দাঁড়ায় চারটিতে। এবার বিশ্বকাপেও তার সামনে রয়েছে পঞ্চম আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের সুযোগ।

শততম ম্যাচের আগে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে স্কালোনি বলেছেন, তিনি নিজেও কখনো কল্পনা করেননি এত দূর আসতে পারবেন। আর্জেন্টিনার মতো ঐতিহ্যবাহী দলের হয়ে ১০০ ম্যাচে দায়িত্ব পালন করাকে তিনি বিশেষ সম্মান হিসেবে দেখছেন। তার ভাষায়, বাস্তবে এই মাইলফলক স্পর্শ করার মুহূর্তটি নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

পরিসংখ্যানও স্কালোনির সাফল্যের শক্ত প্রমাণ দিচ্ছে। প্রথম ৯৯ ম্যাচে তার অধীনে আর্জেন্টিনা জিতেছে ৭২টি, ড্র করেছে ১৮টি এবং হেরেছে মাত্র ৯টি ম্যাচ। এই সময়ে দলটি করেছে ২০৬ গোল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর একটি হলো টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড, যা আন্তর্জাতিক ফুটবলে অন্যতম সেরা ধারাবাহিকতার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ফিফার বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনাকে পক্ষপাতের অভিযোগ, অভিনব পরামর্শ স্কালোনির
স্কালোনির সফলতার আরেকটি বড় দিক হলো লিওনেল মেসির সঙ্গে তার বোঝাপড়া। জাতীয় দলে মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল সময় এসেছে তার অধীনেই। স্কালোনির কোচিংয়ে ৭৪টি ম্যাচ খেলেছেন মেসি, করেছেন ৫৮টি গোল। মাঠের ভেতরে ও বাইরে দুজনের পারস্পরিক আস্থা আর্জেন্টিনার সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে।

খেলোয়াড় হিসেবে স্কালোনির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল সংক্ষিপ্ত। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তিনি খেলেছেন মাত্র সাতটি ম্যাচ। ২০০৬ বিশ্বকাপে ছিলেন তরুণ মেসির সতীর্থ। কিন্তু কোচ হিসেবে তিনি এমন উচ্চতায় পৌঁছেছেন, যা তার খেলোয়াড়ি জীবনের পরিচিতিকে অনেক দূরে ছাড়িয়ে গেছে। একজন রক্ষণভাগের সাবেক ফুটবলার হয়েও তিনি আর্জেন্টিনাকে উপহার দিয়েছেন আধুনিক, গতিময় ও আক্রমণাত্মক ফুটবল।

এই ধারাবাহিক সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবেই তাকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে চায় আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। আগামী ডিসেম্বরে বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাকে আরও পাঁচ বছরের নতুন চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার বিষয়ে নীতিগতভাবে স্কালোনি ইতিবাচক মনোভাবও দেখিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তার সামনে খুলে যাবে আরও একটি ঐতিহাসিক রেকর্ডের দরজা। বর্তমানে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বাধিক ১২৪ ম্যাচে দায়িত্ব পালন করার রেকর্ড গুইলারমো স্তাবিলের। ১৯৪১ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে দুই দফায় প্রায় দুই দশক জাতীয় দলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। শততম ম্যাচের মাইলফলক স্পর্শ করতে যাওয়া স্কালোনির সামনে এখন সেই রেকর্ড ভাঙার বাস্তব সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

ইতোমধ্যে তিনি ম্যাচ পরিচালনার সংখ্যায় পেছনে ফেলেছেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি কোচ সেসার লুইস মেনোত্তি, কার্লোস বিলার্দো, আলফিও বাসিলে ও মার্সেলো বিয়েলসাকে। ফলে এখন তিনি দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বাধিক ম্যাচ পরিচালনাকারী কোচ।

আজ আর্জেন্টিনা দলের পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে স্কালোনির নাম। সমর্থকেরা ভালোবেসে পুরো দলকে ডাকেন ‘স্কালোনেতা’ নামে। যে মানুষটিকে একসময় কেবল অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে দেখা হয়েছিল, তিনি এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন একটি দলের স্থপতি। তাই কেপ ভার্দের বিপক্ষে শততম ম্যাচটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের একটি সংখ্যা নয়; এটি আস্থা, ধৈর্য, পরিকল্পনা ও সাফল্যের এক অসাধারণ যাত্রার প্রতীক, যা আর্জেন্টিনা ফুটবলের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর